অধ্যক্ষ ড. মুফতী মুহাম্মাদ আবু ইউছুফ খান
ভূমিকা
রাগ মানুষের স্বাভাবিক একটি প্রবৃত্তি। তবে অনিয়ন্ত্রিত রাগ মানুষের বিবেক, সম্পর্ক ও শান্তি নষ্ট করে দেয়। বিশেষ করে স্বামী-স্ত্রী, পিতা-মাতা ও সন্তান, বড়-ছোট এবং আত্মীয়-স্বজনের মধ্যে রাগের প্রকাশ অনেক সময় ভালোবাসার সম্পর্ককে ক্ষতিগ্রস্ত করে। ইসলাম রাগকে নিষিদ্ধ করেনি; বরং রাগকে নিয়ন্ত্রণ করে ধৈর্য, ক্ষমা ও উত্তম আচরণের শিক্ষা দিয়েছে।
১. রাগ দমন করা মুমিনের বিশেষ গুণ:
আল্লাহ তাআলা বলেন—
وَالْكَاظِمِينَ الْغَيْظَ وَالْعَافِينَ عَنِ النَّاسِ ۗ وَاللَّهُ يُحِبُّ الْمُحْسِنِينَ
“যারা ক্রোধ সংবরণ করে এবং মানুষকে ক্ষমা করে, আল্লাহ তাদের ভালোবাসেন।”— (সূরা আলে ইমরান: ১৩৪)
শিক্ষা: প্রকৃত শক্তিশালী ব্যক্তি সে নয় যে অন্যকে পরাজিত করতে পারে; বরং সে, যে নিজের রাগকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে।
২. রাসুলুল্লাহ ﷺ রাগ না করার উপদেশ দিয়েছেন:
এক ব্যক্তি রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর কাছে এসে বললেন, “আমাকে উপদেশ দিন।” তিনি বললেন— لَا تَغْضَبْ“রাগ করো না।”-(সহিহ বুখারি: ৬১১৬)
তিনি এই কথা বারবার বলেছেন। এর মাধ্যমে বোঝা যায়, রাগ নিয়ন্ত্রণ করা চরিত্র সংশোধনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
৩. রাগের সময় কঠিন কথা ও অন্যায় আচরণ থেকে বিরত থাকা:
অনেক সময় রাগের মুহূর্তে মানুষ এমন কথা বলে ফেলে, যা পরে অনুতাপের কারণ হয়।
রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন—“মুমিন কখনো অশ্লীল ভাষী, অভিশাপকারী বা কটু ভাষার অধিকারী হয় না।”-(জামে তিরমিজি: ১৯৭৭)
পরিবারে প্রয়োগ:
* স্বামী যেন স্ত্রীর প্রতি অপমানজনক কথা না বলেন।
* স্ত্রী যেন স্বামীর সম্মান নষ্ট হয় এমন কথা না বলেন।
* বড়রা যেন ছোটদের ভুল সংশোধন করেন ভালোবাসার সঙ্গে।
৪. রাগের সময় নীরব থাকা:
রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন—
“যখন তোমাদের কারো রাগ আসে, সে যেন নীরব থাকে।”— (মুসনাদ আহমাদ: ২১৩৬)
কারণ: রাগের সময় মুখের কথা অনেক সময় সম্পর্কের ক্ষতি করে।
৫. রাগের সময় স্থান ও অবস্থান পরিবর্তন করা:
রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন—
“তোমাদের কারো রাগ হলে সে যদি দাঁড়িয়ে থাকে, তবে সে যেন বসে যায়; আর যদি রাগ চলে যায় ভালো, নতুবা সে যেন শুয়ে পড়ে।”— (সুনানে আবু দাউদ: ৪৭৮২)
পদ্ধতি:
* দাঁড়িয়ে থাকলে বসে যান।
* বসে থাকলে শুয়ে পড়ুন।
* সম্ভব হলে কিছু সময়ের জন্য স্থান পরিবর্তন করুন।
৬. রাগের সময় আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাওয়া:
রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন—
“আমি এমন একটি বাক্য জানি, যা বললে তার রাগ চলে যাবে; তা হলো—
أَعُوذُ بِاللَّهِ مِنَ الشَّيْطَانِ الرَّجِيمِ
‘আমি বিতাড়িত শয়তান থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাই।’”— (সহিহ বুখারি: ৩২৮২; সহিহ মুসলিম: ২৬১০)
৭. স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে রাগ নিয়ন্ত্রণের ইসলামী পদ্ধতি:
* একে অপরের ভুল ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখা।
* রাগের সময় পুরোনো অভিযোগ তুলে না ধরা।
* অপমান নয়, সুন্দরভাবে সমস্যার সমাধান করা।
* মনে রাখা—দাম্পত্য সম্পর্ক ভালোবাসা ও দয়ার ওপর প্রতিষ্ঠিত।
আল্লাহ বলেন—
وَجَعَلَ بَيْنَكُم مَّوَدَّةً وَرَحْمَةً
“তিনি তোমাদের মধ্যে ভালোবাসা ও দয়া স্থাপন করেছেন।”— (সূরা আর-রূম: ২১)
৮. সন্তানদের প্রতি রাগের পরিবর্তে শিক্ষা ও মমতা:
সন্তানের ভুল হলে তা সংশোধন করতে হবে, কিন্তু অপমান করা যাবে না।
রাসুলুল্লাহ ﷺ শিশুদের প্রতি অত্যন্ত স্নেহশীল ছিলেন। তিনি বলেছেন—
“যে ব্যক্তি ছোটদের প্রতি দয়া করে না এবং বড়দের সম্মান করে না, সে আমাদের অন্তর্ভুক্ত নয়।”— (জামে তিরমিজি: ১৯২১)
৯. ক্ষমাশীলতা রাগের উত্তম চিকিৎসা:
আল্লাহ তাআলা বলেন—
وَأَن تَعْفُوا أَقْرَبُ لِلتَّقْوَى
“তোমরা ক্ষমা করলে তা তাকওয়ার অধিক নিকটবর্তী।”— (সূরা আল-বাকারা: ২৩৭)
ক্ষমা পরিবারে ভালোবাসা ও শান্তি বৃদ্ধি করে।
১০. রাগ নিয়ন্ত্রণের বাস্তব অনুশীলন:
* রাগ উঠলে ১০ সেকেন্ড চুপ থাকা।
* গভীরভাবে শ্বাস নেওয়া।
* ওজু করা।
* আল্লাহর স্মরণ করা।
* নিজের ভুলও বিবেচনা করা।
* প্রতিদিন ধৈর্য ও উত্তম চরিত্রের জন্য দোয়া করা।
রাগ মানুষের স্বাভাবিক অনুভূতি, কিন্তু রাগের বশবর্তী হয়ে অন্যায় করা ইসলামের শিক্ষা নয়। রাসুলুল্লাহ ﷺ আমাদের শিখিয়েছেন-নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করা, ক্ষমা করা এবং উত্তম আচরণের মাধ্যমে পরিবার ও সমাজে শান্তি প্রতিষ্ঠা করা। যে ব্যক্তি রাগের মুহূর্তে নিজেকে সংযত করতে পারে, সে আল্লাহর কাছে মর্যাদাবান ও মানুষের কাছে প্রিয় হয়ে ওঠে।